প্রচ্ছদসাহিত্য

একগুচ্ছ কবিতা- নজর উল ইসলাম

মণিপদ্মে মন রেখে

মণিপদ্মে মন রেখে গুঁজে দিই খোঁপায় প্রজাপতি
জীবন আলো হয়, শহর হয়, রমণগন্ধের মহাচিত্রণ
হৃদয়বান পাখিরা ভাষ্যে ওড়ায় ফাগুনের আগুন
অপূর্ব যোজনার এমন মরুবিজয় অকাতরে বাজে
সমুদ্র শোভায় ঋতুস্নান সারে মন-কোকিল —
পরাগ সংরাগে ছুঁয়ে দেয় নিভৃত সম্পদ 
ব্যাকুল চেনা অচেনার অনুরণন অবিরত আকাশ ছোঁয়
আলোর খেলা যতটা সূর্য জানে তারও চেয়ে অন্ধকার—
বুঝি সহস্র পুণ্যবান নিশ্চিত ক্ষরণের শস্য বোনে
যা-দেখি স্বকীয় আমার গদ্যের ভুবন 
ক্যালিগ্রাফি দেখেছি অনুভব সততায় নিবিড় রাঙানো
দাঁড়িয়ে পড়েছি তামাশার দিনও পরিসর সুলগ্ন
নির্ভরতায় পেয়েছি শূন্যের কোঠায় বৃহত্তর অগ্নিসম্ভবা
চেতনায় জুড়ে যায় দীর্ঘযাপন প্রতিটি উৎস-মুখ 
নির্মাণবোধ গ্রহণের মৃগয়াভূমি পায় জীবনজমিন...

দু’টি পথ

দাগাবাজ সেজে মিথ্যের জাল বুনে যে অভিমুখ দেখালে
সে বৃত্তে যাব না, ঋতুরঙ্গ নিছক বিনোদন–সৃজন জানি
কৌশলে এত খেলা রসাভাস ওড়াও তুমি
আমি তো মেঘশরীরে আনচান উৎযাপন দেখি
নাচের জলসাঘরে আদুরে ছলাৎছল নিসর্গের উন্মুখ আগুনে
রোমন্থনময় প্রতিক্ষণে হৃদয়ক্ষরণের ঘাম ওঠে
অবুঝের এই নিঃসঙ্গতা একতারায় ধরে না
নদীও যাপনের আলেখ্য লেখে উদাসী ভুবনে
নিবিড় একা আকুলে আলো জোছনায় নির্বাক জীবনচিহ্ন
বিরহের সুদীর্ঘ যাত্রাপথে বিরক্ত আমার মনও
বিমোহন পোষা হলদে হওয়া দিনগুজরান কাঙাল-মনপাড়ায়
সারাক্ষণ আকাশ আঁকি, গা-ঘেঁষে উড়ে যায় উড়ন্ত অভিমান
পৃথিবী সব জানে আবহমান জলতরঙ্গ জানে অমোঘ শিকার
অবিকল আলো-আঁধারিতে কত গোলাপ স্ফুরিত হয়
কত বলাকা ওড়ে শ্বেতশুভ্র পাখায় সোনাঝুরি ফেনায়
একটু ভালোবাসা ছাড়া কী দোষে দুষ্ট বলো— আমি যে
মরীচিকা দেখিনি, দেখিনি অপ্রয়োজনীয় আনয়ন
আনত পড়েছি তোমার, তাকিয়ে থেকেছি অসামান্য অনুনয়ে
এখন অনন্তের আলোকিত আলো, ছায়ায় ভরাট ক্ষতচিহ্ন
নিঃসঙ্গতায় উপুড় অজান্তে ভাগ হয়ে যাওয়া দু’টি পথ…

পরম্পরা

তোমার অরণ্যের অধিকার ছিনিয়ে নিতে চাই না
কেবল নান্দনিক মোহিত ভেবেছি
উৎকর্ষতা বহুমাত্রিক উড়াল পলকে দৃঢ় হয়
যেমন অন্ধকার নির্মাণের জ্বলন্ত উচ্চারণ
অতিথির অপেক্ষায় দিনগোনা স্বপ্ন-মোহ
মিথ্যে বলিনি উদ্ভাসে ও রাত্রিকথায়
ঝোঁক গতিশীল চুম্বকের সৃজনভূমি
যতই ডানা ছেঁটে দাও সুরে-ছন্দে অভিনব
নিঃসঙ্গ প্রাচীর ভাঙে ঠিক-ই তা বলে
সাধনা আর ব্রত একাঙ্গ হলে জমাট মলাট
জলছবির অনুষঙ্গে খুনসুটি দিয়ে ওঠে
আর আমরা পাগলের মত মাতাল হই
অবিরাম ঝরে পড়ে মেঘের মনকুচি
পরম্পরায় ভিজে যাই নিপুণ ছাঁচে…

বিপন্ন ভালোবাসা

মেঘভাষ্য লিখতে গিয়ে স্বপ্নাতুর রোদ্দুর গোটানো হৃদয় লিখি
স্মৃতি-বিস্মৃতি উপড়ে আসে অশ্রুসজল আবহমান
কাঠগোলাপের মতো দাঁড়িয়ে যেন ভাস্বর আর আমি নির্লিপ্ত পিপাসায়
সুর ওঠে না—কত মন মেরে মণিকোঠায় জল আসে
বুঝি সব রং জীবন বোঝে না,মন বোঝে না কেবল বাঁচন
চাঁদ ওঠে মন ওঠে না গভীর গণতন্ত্রে গা-ভাসা প্রত্যয়
আত্মাকে বলি তুই বোঝ,ভাইরে শান্ত হ,এই পৃথিবী
এটা বাস্তবতা লুকিয়ে কাঁদিস কেন,হ্যাঁ প্রত্যাশার যাপনচিত্র
মাটি হওয়া প্রেম আজন্ম বাউলের আকন্ঠ আগুন
প্রীতি নেই পবিত্রতা নেই শুধু নির্জনতায় মত্ত উন্মুখ
ভালোবাসা বলে কিছু আছে আর,যারা ভালোবাসে
বিমূর্ত মন ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে পদ্মনাভিতে ফেরা
ক্ষয়ের ইতিহাস লেখা প্রাক বিহ্বল ভুবনডাঙা
বিমোহন সব বিমোহন অলেখা আলেখ্য সংক্রমিত
ডানাযুদ্ধের হাহুতাশ পোষা এক শীতের বিকেল বিপন্ন
ভাঙা আয়নার জ্বালামুখ ছিটকে অসংখ্য চুক্তিহীনতা
মুখের ওপর ছুড়ে দেয় জোনাকির গোপন মৃত্যুর আশ্রয়…

কথকতার দিব্য সাঁতার

চোরাবালির চোখ কথা হয়ে ওঠে নিমগ্ন আত্মরেখায়
মহাশ্মশান জাগে প্রেম খসা ঢেউ মুখে
অহংকার ফোটে মনভ্রমে পালিত মরাখাতে
অভিমান জানে নিবিড় অরণ্যের যৌথ পরিবেশন
নিভে যাওয়া শোক অতিক্রম করে দেখি সব বিষাদঘর
বিবাদী মেঘ যেন যৌতুক নিয়ে ছিল জমা উপেক্ষার দিন
আর দিন ফুরিয়ে রাশ রাশ ঘামজন্ম বিস্ময়চিহ্নে মনাহত
চেনা মুখ অচেনা কষ্টের ছবি দেখে রাত দেখে অশ্রুত নিকষ
আয়ুর বাগান থেকে সব বাঁধন ছেনে অপেক্ষায় অলীক
বেবাক চেয়ে থাকা পাখিদের প্রেমিক মমত্ব আলো আনে
প্রতি ভাষ্যে নৈঃশব্দ্যের মরমী গান ছুঁয়ে দেয় শরীরে
পায়ে পা-জড়িয়ে যায় মন আড়ষ্ট একগাছি নত
শিল্প হয় জল ছলছলে বিমর্ষ স্বপ্নের অঝোর অন্ধকার
সব আলপনায় নিখোঁজ বেদনার্ত কথকতার অপূরক আক্ষেপ
বাঁশি হয় ফুল-সুর ছেঁড়া নির্মোহ ভবিষ্যপুরাণ একক…
error: Content is protected !!