প্রচ্ছদফিচার

মিশরে রবীন্দ্রনাথ- কাজী একরাম- মুক্তগদ্য

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইউরোপ ভ্রমণ থেকে প্রত্যাবর্তন কালে মিশরে গিয়েছিলেন। যেহেতু প্রাচ্যবাসীদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথই নোবেল পুরষ্কারপ্রাপ্ত প্রথম ব্যক্তি, তাই তাঁকে প্রাচ্য দেশগুলো, বিশেষকরে মিশরে খুব সম্মান এবং মর্যাদার চোখে দেখা হয় এবং তাই রবীন্দ্রনাথের যে সমাদৃতি মিশরে দেখা যায়, এর দৃষ্টান্ত অন্য কোনো প্রাচ্যদেশে বিরল।

১৯২৬ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বরের শেষপাদে রবীন্দ্রনাথ মিশরে পৌঁছান। যাওয়ার পর থেকে, সেখানকার সমস্ত পত্রিকায় এবং ম্যাগাজিনে, ছবিসহ তাঁর জীবনবৃত্তান্ত, তাঁর একাডেমিক ও সাহিত্যিক সেবাকর্ম এবং তাঁর বিশ্বাস-মতাদর্শ সম্পর্কে বিস্তৃত নিবন্ধ প্রকাশিত হয়।

মিশরের সাঈদ বন্দরে থাকতেই তাঁকে স্বাগত জানাতে মিশরের বিশিষ্ট পণ্ডিতদের একটি দল জাহাজের কাছে জড়ো হয় এবং একটি চায়ের আমন্ত্রণে তাঁর সাথে বিভিন্ন একাডেমিক বিষয়, বিশেষত কবিতা ও কবিত্ব নিয়ে বিস্তারিত কথোপকথন চলে। এ প্রসঙ্গে তাঁর কাছ থেকে আরবি ভাষা ও আরবি সাহিত্যশাস্ত্রের ইতিহাসের উপরও বিস্তারিত ভাববিনিময়ের অনুরোধ করা হয়, কিন্তু যেহেতু রবীন্দ্রনাথের এখন পর্যন্ত পাশ্চাত্য ভাষা বা ভারতের বিভিন্ন ভাষার সাথেই কেবল জান-পেহচান ছিল, তাই তাঁর অভিনিবেশ-অনুশীলনও এসব ভাষার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, যার কারণে তিনি আরবি ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি মনোযোগ দিতে পারেননি। কিন্তু এই বিষয়টি উত্থাপনের ফল এভাবে প্রকাশ পেয়েছে যে, প্রাচ্যের এই মহান কবি, প্রাচ্যের সবচেয়ে উন্নত এবং সমৃদ্ধ ভাষার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন এবং মিশরের তরুণ-যুবাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন আরবি ভাষাজ্ঞান অর্জনের।

২৭ নভেম্বর মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ায় যান এবং গুণীজনদের একটি নির্বাচিত মণ্ডলীতে তিনি ‘প্রশান্তির আত্মা’ বিষয়ে একটি আকর্ষণীয় বক্তৃতা প্রদান করেন। ২৯ তারিখে, আলেকজান্দ্রিয়া থেকে কায়রোতে আসেন। কায়রোতে মিশরের সমকালীন শ্রেষ্ঠ কবি ‘সুলতানুশ শুআরা’ খ্যাত আহমেদ আশ-শাওকি চায়ের আমন্ত্রণ জানান রবীন্দ্রনাথকে, যেখানে বিশিষ্ট লেখকবৃন্দ ছাড়াও সরকারি বিভিন্ন পদস্থ ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন, যাদের মধ্যে পার্লামেন্ট সভাপতি সাদ জঘলুল পাশা, এবং প্রধানমন্ত্রী আদিল পাশা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

একইদিন সন্ধ্যায় তিনি হাদীকায়ে আযকিয়ায় (উদ্যান) এক সাধারণ জনসভায় একটি বক্তব্য প্রদান করেন, যাতে সর্বশ্রেণীর মানুষ উপস্থিত ছিল। এরপর মিশরের শিক্ষামন্ত্রী রবীন্দ্রনাথকে স্বাগত জানাতে একটি বিশেষ মজলিসের আয়োজন করেন। চা পর্ব শেষ করে, শিক্ষামন্ত্রী তাঁর একটি  দীর্ঘ বক্তৃতায় রবীন্দ্রনাথের প্রশংসা করেন এবং তাঁর পরিভ্রমণকে অভিনন্দিত করেন। এর পরে রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত বাগবিদগ্ধ ও বিস্তৃত একটি বক্তৃতা রাখেন।

এসব সম্মাননা ও সমাদর ছাড়াও, সেখানকার বিখ্যাত কবিগণ যাদের মধ্যে আবু শাদি সবিশেষ উল্লেখযোগ্য, রবীন্দ্রনাথের মাহাত্ম্যে কাসীদা (স্তুতিকাব্য) উপস্থাপন করেন। এতে তাঁর একাডেমিক, সাহিত্যিক, শিক্ষামূলক এবং মানবিক কল্যাণ সম্পর্কিত সমূদয় পরিসেবার উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি, তাঁর নির্দিষ্ট দর্শন এবং সাধারণ লেখাগুলির উপরও পর্যালোচনা করা হয়। এভাবে তাঁর নিকটজন, আত্মীয়-বন্ধুদের সম্পর্কেও, যাদের মধ্যে নন্দলাল বোস বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, অত্যন্ত সম্মানসূচক শব্দ-অভিধা ব্যবহার করা হয়।

রবীন্দ্রনাথ মিশর থেকে চলে এসেছেন বটে, কিন্তু  সেখানকার জ্ঞানীকূলের হৃদয়কেও নিজের সাথে নিয়ে এসেছিলেন। একটি দল প্রস্তুত ছিল যারা হিন্দুস্তানে এসে রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন পরিদর্শন করতে এবং উপকৃত হতে আগ্রহ প্রকাশ করে। মিশর থেকে তাঁর প্রত্যাবর্তনের পরেও, অনেকদিন ধরে তাঁকে নিয়ে আলাপ-আলোচনা হতে থাকে। তাঁর জীবনী, তাঁর সৃষ্টিকর্ম নিয়ে চলতে থাকে পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন।

তথ্যসূত্র: মাআরিফ, (আজমগড় থেকে প্রকাশিত জার্নাল), প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি, ১৯২৭ খ্রি. ভলিউম, ১৯।

 

আরও পড়ুন-  চিঠি নিয়ে মুক্তগদ্য

 

error: Content is protected !!